মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া :রাজধানীসহ সারা দেশে ভাইরাসজনিত জ্বরের প্রকোপ বাড়ছেই।বিশেষ করে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং করোনা ভাইরাসের নতুন উপধরনের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুন থেকে অক্টোবর-এ সময়কালকে ভাইরাস জ্বরের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল হিসাবে বিবেচনা করা হয়। মঙ্গলবার বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে (বিএমইউ) অনুষ্ঠিত সিএমই সেশনে চলমান ভাইরাস জ্বরের সংক্রমণ নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সেমিনারে এসব তথ্য জানানো হয়। এ সময় কনটিনিউইং মেডিকেল এডুকেশনে (সিএমই) ভাইরাস জ্বরের পরিস্থিতি নিয়ে পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। বলা হয়, ধারাবাহিকতাভাবে হাসপাতাল ও বহির্বিভাগে ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত রোগী দ্রুতগতিতে বাড়ায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করছে। এ অবস্থায় চিকিৎসা খাতে প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো ও জনসচেতনতা না বাড়ালে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
সেমিনারে বিএমইউর মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবেদ হোসেন খান ‘রিসেন্ট ট্রেন্ড ইন ফেব্রাইল ইলনেসেস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, এ মুহূর্তে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও করোনা তিন ভাইরাস স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ সংক্রমণ হচ্ছে বরিশাল ও বরগুনায়। চলতি মাসের সোমবার পর্যন্ত ১ হাজার ৮৭৭ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি সপ্তাহেই বরিশালে ৫ ও ঢাকায় দুজন ডেঙ্গুতে মারা গেছেন।
এদিকে রোববার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৩৯৪ জন ভর্তি হয়েছেন। তবে এই সময়ে ডেঙ্গুতে দেশে কারও মৃত্যু হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মধ্যে বরিশাল বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১৫৭ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৫৮ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৩৫ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৫০ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৪২ জন, খুলনা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৮ জন, রাজশাহী বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৪৪ জন রয়েছেন। এছাড়া, গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৫৩ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। চলতি বছর ছাড়পত্র পেয়েছেন ৭ হাজার ৪৩০ জন। চলতি বছরের ১৩ জুন পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৮ হাজার ৫৪৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৩৪ জনের।
বিএমইউর মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবেদ হোসেন খান জানান, বর্তমানে ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ডেন-১, ডেন-২ এবং ডেন-৩ সেরোটাইপ সক্রিয় পাওয়া গেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, মশা নিয়ন্ত্রণে অব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ডেঙ্গু সংক্রমণ বৃদ্ধির মূল কারণ। এর আগে এটি ঢাকাকেন্দ্রিক থাকলেও এখন সারা দেশেই বিস্তার দেখা যাচ্ছে। এবার ১৬ থেকে ২৫ বছর বয়সি তরুণদের মধ্যেও সংক্রমণের হার বাড়ছে, যা অতীতে তুলনামূলক কম ছিল।
চিকুনগুনিয়া প্রসঙ্গে এই চিকিৎসক জানান, দীর্ঘস্থায়ী জটিলতা নিয়ে দেশে উপেক্ষিত ভাইরাস জ্বর ফিরছে। ২০১৭ সালের পর আবারও চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। গত বছরের ১৯ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ২২ এপ্রিল পর্যন্ত ৫২০ জন সন্দেহভাজন রোগীর মধ্যে ১৬১ জন চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। চিকুনগুনিয়ায় মৃত্যুর হার কম হলেও, রোগের পরে গেঁটেব্যথা, র্যাশ, দুর্বলতা এমন উপসর্গ দীর্ঘমেয়াদে রোগীর জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে এটিকে সাধারণ ভাইরাস জ্বর ভেবে অবহেলা করা যাবে না।
ডেঙ্গুর চিকিৎসায় পর্যাপ্ত বিশ্রাম, তরল খাবারের সঙ্গে প্যারাসিটামলই যথেষ্ট : সেমিনারে ‘ডেঙ্গু গাইডলাইন ২০২৫ : হোয়াট হ্যাজ চেঞ্জড’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল হাসান। তিনি ডেঙ্গুর চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক, ব্যথানাশক, স্টেরয়েড ও ঘরোয়া প্রতিকার ব্যবহারের পরিবর্তে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, তরল খাবার গ্রহণ এবং প্যারাসিটামল ব্যবহারে জোর দেন। ডা. মো. নাজমুল হাসান বলেন, ডেঙ্গুজ্বরের হালকা উপসর্গ যেমন; ৩ থেকে ৫ দিনের জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরে ব্যথা থাকলে রোগীকে হাসপাতালে না নিয়ে বাড়িতে বিশ্রাম ও পর্যাপ্ত তরল পানীয় (স্যালাইন, ফলের রস, স্যুপ) খাওয়াতে হবে। জ্বর কমাতে শুধু প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যাবে, যার দৈনিক সর্বোচ্চ মাত্রা ৩ গ্রাম। অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন এবং অন্যান্য ব্যথানাশক জাতীয় ওষুধ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। এসব ওষুধ রক্তপাতের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
সবাইকে সতর্ক করে তিনি বলেন, স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ যেমন ডেক্সামেথাসন ও হাইড্রোকরটিসন ডেঙ্গু রোগীর জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। এসব ওষুধ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করে এবং ফুসফুসে পানি জমার ঝুঁকি বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব ওষুধ ডেঙ্গু চিকিৎসায় কার্যকর নয়। বরং কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে। তবে রোগীর জ্বর কমে যাওয়ার পর যদি হঠাৎ শরীর খারাপ বোধ করে, বারবার বমি হয়, পেটে তীব্র ব্যথা দেখা দেয়, রক্তপাত শুরু হয়, দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, অজ্ঞান হওয়া, মাথা ঘোরা বা চামড়া মলিন হয়ে এলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
নাজমুল হাসান বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের রক্তের প্লাটিলেট বাড়ানোর ঘরোয়া পদ্ধতি হিসাবে পেঁপে পাতার রস ব্যবহারে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। পেঁপে পাতার রস অতিরিক্ত বা ভুল মাত্রায় গ্রহণ করলে বমি, পেটব্যথা এমনকি লিভারের সমস্যাও সৃষ্টি হতে পারে। একজন ডেঙ্গু রোগীর প্লাটিলেট ট্রান্সফিউশন তখনই প্রয়োজন হয় যখন রোগীর প্লাটিলেট সংখ্যা ১০ হাজারের নিচে নামে। রক্তপাত দেখা দেয় অথবা কোনো অপারেশন বা ইনভেসিভ প্রসিডিউরের প্রয়োজন পড়ে। শুধু প্লাটিলেট কম থাকার কারণে রক্ত দেওয়ার সিদ্ধান্ত বিপজ্জনক হতে পারে। হিমোগ্লোবিন খুব কমে গেলে বা রক্তপাতজনিত শক দেখা দিলে সম্পূর্ণ রক্ত বা রেড ব্লাড সেল ট্রান্সফিউশন বিবেচনা করা যেতে পারে।
সেমিনারে আরও বলা হয়, দেশের প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু কর্নার ও ফিভার ক্লিনিক চালু করা উচিত। এসব ক্লিনিকে আইভি ফ্লুইড, রক্ত, রক্তের উপাদান এবং জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসক ও নার্সদের ডেঙ্গু শনাক্তকরণ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
সেমিনারে আরও জানানো হয়, বর্তমানে করোনা রোগীরা মূলত ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের অন্তর্গত জেএন.১ সাব-ভ্যারিয়েন্টের দুটি শাখা এক্সএফজি ও এক্সএফসি দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ভ্যারিয়েন্টগুলোকে ‘ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্ন’ না বলে ‘ভ্যারিয়েন্ট অব মনিটরিং’ হিসাবে তালিকাভুক্ত করেছে। অর্থাৎ এদের বিষয়ে নজরদারি প্রয়োজন হলেও এখন পর্যন্ত এগুলোর কারণে ভয়াবহ জটিলতা দেখা যাচ্ছে না।