মোহাম্মাদ আবুবকর সিদ্দীক ভুঁইয়া:আমাদের সমাজে অভাবে কেউ দুর্নীতি করে না, সীমাহীন লোভের বশীভূত হয়েই দুর্নীতি করে। দুর্নীতি আজ ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। অধিকাংশ অপরাধের অন্যতম প্রধান উৎস হলো দুর্নীতি। এটি এমন একটি ব্যাধি, যা সমাজের মূল কাঠামো ধ্বংস করে।দুর্নীতিবাজদের নিয়ে সবচেয়ে সুন্দর সংজ্ঞাটা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘আজ কে দুর্নীতিবাজ? যে ফাঁকি দেয়, সে দুর্নীতিবাজ। যে ঘুস খায়, সে দুর্নীতিবাজ; যে স্মাগলিং করে সে দুর্নীতিবাজ; যে হোর্ড করে, সে দুর্নীতিবাজ। যারা বিবেকের বিরুদ্ধে কাজ করে, তারাও দুর্নীতিবাজ। যারা বিদেশের কাছে দেশকে বিক্রি করে, তারাও দুর্নীতিবাজ।’ এরচেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যা আর কি হতে পারে।
গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের অঙ্গীকার করেছে। ইশতেহার পুস্তিকার (চ) ধারায় বলা হয়েছিল, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জাতির নৈতিক উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় দুনীতি। দুর্নীতির কারণে দেশের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয় না। কেবল আইন প্রয়োগ ও শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন করা সম্ভব নয়। তার জন্য প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। আওয়ামী লীগ দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে সমাজ তথা রাষ্ট্র থেকে দুর্নীতির মূলোৎপাটন করা হবে।’ এটাই শেখ হাসিনার সরকারের অঙ্গীকার। সরকার সেলক্ষ্যই কাজ করে যাচ্ছে।
স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কয়েক দফায় বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু ঘুস-দুর্নীতি আশানুরূপ কমেনি। বর্তমান বাজার মূল্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বেতন দ্বিগুণ করা হলেও এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘পে স্কেলে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে হারে বেতন বেড়েছে, তা বিশ্বে বিরল। তাই জনগণ যাতে সেবা পায় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। বেতন সেহেতু বেড়েছে তাই ঘুস দুর্নীতি সহ্য করা হবে না।সে সময় অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সফলতার কারণে জনগণের মধ্যে একটা আস্থার জায়গা তৈরি করেছিলেন। এটা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির ভয়াবহ যে অভিযোগ উঠেছে, এটা সবাইকে বিস্মিত করেছে। বেতন-ভাতা বাড়ানোর কারণে বহু মেধাবী তরুণের কাছে সরকারি চাকরি লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বেতন ও অবসর ভাতা মিলিয়ে সরকারের ব্যয় প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা, যা জাতীয় বাজেটের প্রায় ১৫ শতাংশ। সরকারি চাকরিজীবীদের বহু সুবিধার পরও যারা মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতি করে আসলে তারা অভাবে নয়, স্বভাবে করে।
সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বিভিন্ন সেক্টর ডিজিটালাইজেশন করা হয়েছে। যার কারণে জনগণের ভোগান্তি হ্রাস, অনলাইন টেন্ডার, দুর্নীতি সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ বিনা খরচায় ১০৬ নম্বরে ফোন করে জানাতে পারছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন বাড়ানো হয়েছে। বিচারের কাজে গতি আনা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে দুর্নীতি প্রতিরোধের নিমিত্তে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল প্রণয়ন, নাগরিক সনদ রচনা, তথ্য অধিকার আইন প্রণয়ন এবং অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা তার সময়কালে বেশ কয়েকবার দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছেন। সেখানে দলীয় নেতা কিংবা প্রভাবশালী কাউকে ছাড় দেওয়া হয়নি। তাকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। দলের অনেক নেতাকেই বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ২০১৯ সালে ক্ষমতায় এসে চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজি, ক্যাসিনো, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করেছিলেন। তখন ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ দলীয় নেতাকর্মীদের কাউকে ছাড় দেওয়া হয়নি। শুধু এসব অনিয়মের কারণে অনেকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে।
দুর্নীতি সরকার একা বন্ধ করতে পারবে না। এর বিরুদ্ধে দরকার সামাজিক আন্দোলন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সমাজে দেখা যায়, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদেরই প্রধান অতিথি করা হয়, যারা বেশি অর্থ দিতে পারবে। তাদেরই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটিতে রাখা হয় যারা অনুদান দিতে পারবে। অথচ আয়োজকরা একবারও তার আয়ের উৎস বিবেচনা করেন না।
সমাজের এক শ্রেণির মানুষ দুর্নীতিবাজদের টাকার কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করে যাচ্ছে। সমাজ এতটাই নষ্ট হয়ে গেছে যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্রী কিংবা পরিবার চিন্তা করে পাত্রের চাকরির পদমর্যাদার চেয়ে উপরি ইনকাম আছে কি না? সেটিই বিবেচনা করে। এখন ঘুস খাওয়াকে কিছু লোক ফ্যাশন বা স্মার্টনেস বলেই মনে করে।
অনেক সময় দেখা যায়, দুর্নীতিবাজরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যান। আবার কখনো আমলে নেওয়ার পরও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে তদন্ত প্রক্রিয়া ব্যাহত কিংবা দীর্ঘায়িত হয়। ফলে দুর্নীতি রোধ করাও সম্ভব হয় না। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ে শান্তি নিশ্চিত করতে হবে। অর্থ ও সম্পদ দ্রুত সরকারের হেফাজতে নিতে হবে। যখন দেখা যাবে বড় বড় রাঘববোয়াল পার পাচ্ছে না, তখন অনেকেই দুর্নীতি করতে সাহস পাবে না। তবে আশার কথা হলো গুটিকয়েক ব্যক্তি দুর্নীতি করলেও এখনো অধিকাংশ মানুষই সৎ। যার সুফলও পাচ্ছে দেশ।
স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা সবসময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি (অর্থাৎ দুর্নীতিকারী যে-ই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে, তার কোনো ছাড় নেই) গ্রহণ করে না চলেছেন। তিনি কোনো অন্যায় অনিয়মকে প্রশ্রয় দেন না। ২০১৯ সালে অক্টোবরে ভয়েস অব আমেরিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বৈরশাসক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সুন্দর ও তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছিলেন, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান যদি না চালাই, তাহলে আমাদের সমাজে একটা বিরাট বৈষম্য সৃষ্টি হয়ে যাবে। সমাজে একজন যখন একজন সৎভাবে জীবনযাপন করছে, আরেকজন একই কাজ করেও দুর্নীতির মাধ্যমে বিশাল অর্থের মালিক হচ্ছে। তাদের জীবনযাপনে সেই বৃত্তের প্রকাশ ঘটানো হচ্ছে ‘অসুস্থভাবে’। এর প্রভাব পড়ছে ছেলেমেয়েদের ওপর। সম্পদ দেখানোর একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা, একটা অসুস্থ মানসিকতা- এখান থেকে আমাদের সমাজটা রক্ষা করতে হবে।
স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার ওপর বাংলার জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা আছে। তিনিও সবসময়ই জনগণের আস্থার প্রতিদান দেন। এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। বেনজীর আহমেদ কিংবা মতিউর রহমান দোষী কি নির্দোষ সেটা বিচারের মাধ্যমে ফয়সালা হবে, সেটা সময় সাপেক্ষ্য বিষয়। কিন্তু জন আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে বেনজীর আহমেদের সব সম্পত্তি সরকারের হেফাজতে নেওয়া কিংবা মতিউর রহমানকে সব দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এমন ত্বরিত সিদ্ধান্ত সরকারের প্রতি জনমনে আস্থা আরো গভীর হবে। এসব কার্যক্রমে কিছুটা হলেও দুর্নীতিবাজরা ভয় পাবে। শেখ হাসিনার আমলে যে যতই ক্ষমতাশালী হোন না কেন, কেউ ছাড় পাবে না- এমন বার্তা স্পষ্ট হয়েছে।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তাকে ও পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলবও করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশে ব্যাংক হিসাব ও অস্থাবর সম্পতি ক্রোক করা হয়েছে। অন্যদিকে রাজস্ব কর্মকর্তা মতিউর রহমানের পুত্রের ১৫ লাখ টাকা দিয়ে ছাগল কেনা নিয়ে খবর হওয়ার পরই তার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির পাহাড়সম অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ ওঠার পর সরকার দ্রুত মতিউর রহমানকে সব দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছে।বাংলাদেশে মাঝে মাঝেই দুর্নীতির খবর চাউর হয়। পুকুর চুরি, সাগর চুরি এসব খবরে জনগণ অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও জাতীয় রাজস্ব কর্মকর্তা মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির যে অভিযোগ উঠেছে, সেটা সত্য হলে চুরির মহাসাগর বললেও কম হবে। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠার পরই দ্রুত অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক।
জন আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে বেনজীর আহমেদের সব সম্পত্তি সরকারের হেফাজতে নেওয়া কিংবা মতিউর রহমানকে সব দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এমন ত্বরিত সিদ্ধান্ত সরকারের প্রতি জনমনে আস্থা আরো গভীর হবে। এসব কার্যক্রমে কিছুটা হলেও দুর্নীতিবাজরা ভয় পাবে। শেখ হাসিনার আমলে যে যতই ক্ষমতাশালী হোন না কেন, কেউ ছাড় পাবে না- এমন বার্তা স্পষ্ট হয়েছে।
পর পর এত বড় দুজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার দুর্নীতি প্রকাশের পর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বেনজীর ও মতিউর ইস্যু টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। পাড়ার চায়ের টেবিল থেকে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত আলোচনার খোরাক জোগাচ্ছে। বেনজীর আহমেদ পুলিশ প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ আইজিপি, র্যাব, ডিএমপি কমিশনারসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।অন্যদিকে মতিউর রহমানের পারিবারিক যে ইতিহাস গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, তাতে মনে হয় ‘সর্ষের মধ্যে ভূত’ আরো অনেক লুকিয়ে আছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন প্রেস ক্লাব-এ সভাপতি।
বাংলাদেশ অনলাইন সংবাদপত্র ও সাংবাদিক ইউনিয়ন-এ এ কেন্দ্রীয় সভাপতি।
বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স ইউনিটি-এ যুগ্ন মহাসচিব কেন্দ্রীয় কমিটি ঢাকা।
বাংলাদেশ সাংবাদিক ও সংবাদপত্র ঐক্য পরিষদ-এ এর কেন্দ্রীয় কমিটি-এ সাধারন সম্পাদক।
আলোকিত বার্তা -এ প্রকাশক ও সম্পাদক
প্রিয় টাইম-এ সম্পাদক